ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার আগে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার আগে যা জানা জরুরি, সেটা শুধু দাম নিয়ে নয়। শহরে ফ্ল্যাটের দাম বড়, কিন্তু তার চেয়ে বড় ঝুঁকিটা লুকিয়ে থাকে কাগজপত্রে। অনেক ক্রেতা সুন্দর ফ্লোর প্ল্যান আর প্রি-লঞ্চ অফারে মুগ্ধ হয়ে বায়নাপত্রে সই করে ফেলেন।
পরে দেখা যায় অনুমোদন নেই, খতিয়ানে ত্রুটি আছে, বা ডেভেলপার সময়মতো হ্যান্ডওভার দিতে পারছেন না।
রাজউকের অনুমোদন, বিল্ডিং পারমিট, ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট আর ফায়ার NOC, এই চারটি কাগজই বলে দেয় একটি প্রকল্প আইনগতভাবে কতটা নিরাপদ। এছাড়া জাতীয় বিল্ডিং কোড BNBC ২০২০ অনুযায়ী ভূমিকম্প সহনশীল নকশা এখন বাধ্যতামূলক। তাই শুরু করা যাক সেই ঝুঁকিগুলো দিয়েই, যেগুলো সবচেয়ে বেশি টাকা খেয়ে ফেলে।
Quick Answer
ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার আগে যা জানা জরুরি, তার প্রথম ধাপ হলো কাগজ যাচাই। জমির দলিল, খতিয়ান ও মিউটেশনের ধারাবাহিকতা দেখুন। রাজউক অনুমোদন আর বিল্ডিং পারমিট যাচাই করুন।
ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া ব্যাংক লোন পাওয়া কঠিন। ডেভেলপারের পুরোনো প্রকল্পের রেকর্ড দেখুন। সব খরচ লিখিতভাবে নিন।
মুখের কথা কাগজে লিখিয়ে নিন।
কেন ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনা একটা উচ্চ-ঝুঁকির আর্থিক সিদ্ধান্ত
ঢাকার রিয়েল এস্টেট বাজারে দাম আগে ঠিক হয়, কাগজ পরে। এটাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় আপনি আসলে তিনটি আলাদা জিনিস কিনছেন।
জমির মালিকানা, বিল্ডিংয়ের অনুমোদন, আর ডেভেলপারের প্রতিশ্রুতি। তিনটির যেকোনো একটি দুর্বল হলে বাকি দুটি সেই ক্ষতি টেনে ধরতে পারে না।
জমি, আইন আর ডেভেলপার, তিন জায়গায় ঝুঁকি
- জমির ঝুঁকি: একই জমিতে একাধিক দলিল, উত্তরাধিকার বিরোধ, বেনামি মালিকানা।
- আইনি ঝুঁকি: রাজউক অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ, অনুমোদিত নকশা ভেঙে বাড়তি ফ্লোর, ফায়ার NOC না থাকা।
- ডেভেলপার ঝুঁকি: প্রকল্প মাঝপথে আটকে যাওয়া, হ্যান্ডওভারে দীর্ঘ দেরি, কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা।
আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, বায়নাপত্র স্বাক্ষরের আগে ডেভেলপারের আগের দুইটি প্রকল্পের হ্যান্ডওভার সময় যাচাই করলে ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।
ভুল হলে কী কী ক্ষতি হতে পারে
প্রথম ক্ষতিটা আর্থিক। বুকিং মানি আর ডাউন পেমেন্ট ফেরত পেতে বছরের পর বছর মামলা লেগে যেতে পারে। দ্বিতীয় ক্ষতিটা আইনি।
ত্রুটিপূর্ণ দলিলে রেজিস্ট্রেশন হলে ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট বিক্রি বা ব্যাংকে বন্ধক দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয় ক্ষতিটা ব্যবহারিক। হ্যান্ডওভার দেরি হলে ভাড়া বাসার খরচ আর লোনের কিস্তি একসাথে চালাতে হয়। ফলে মাসিক বাজেট ভেঙে পড়ে।
দলিল, খতিয়ান, মিউটেশন আর রাজউক অনুমোদন, যে কাগজগুলো নিজে যাচাই করবেন
কাগজ যাচাই মানে শুধু দলিলের ফটোকপি দেখা নয়। মূল দলিল, খতিয়ান, মিউটেশন আর অনুমোদনের ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা। এই কাজে দুই-তিন দিন লাগলেও বাঁচাতে পারে লক্ষ টাকা।
সুতরাং নিজে যাচাই না করে সই করবেন না।
জমির মালিকানা, সাফ-কবলা ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি
প্রথমে জানুন জমির প্রকৃত মালিক কে, আর তিনি এখনও জীবিত কি না। সাফ-কবলা দলিলের ধারাবাহিকতা দেখুন, অর্থাৎ প্রতিটি হস্তান্তর ঠিকভাবে রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে করা জমিতে বাড়তি সতর্কতা দরকার। কারণ কখনও কখনও মূল মালিক জানেনই না তাঁর জমি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ওয়ারিশ সনদ বা উত্তরাধিকার সনদ থাকলে সেটিও যাচাই করুন।
খতিয়ান, পর্চা ও মিউটেশনের ধারাবাহিকতা
সিএস, এসএ, আরএস, বিএস আর পিএস খতিয়ানের চেইন মিলছে কি না দেখুন। নামজারি বা মিউটেশন ঠিকভাবে হয়েছে কি না, তা বোঝা যায় খতিয়ানে নাম বসেছে কি না দিয়ে।
ই-পর্চা সেবার মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। মিউটেশন হয়ে থাকলেও খতিয়ান হালনাগাদ না থাকলে পরে জটিলতা তৈরি হয়।
রাজউক অনুমোদন, বিল্ডিং পারমিট ও ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট
ঢাকা মহানগরে প্রকল্পের অনুমোদন দেয় রাজউক। প্রকল্পের নাম আর প্লট নম্বর দিয়ে অনুমোদন যাচাই করা যায়।
বিল্ডিং পারমিট দেখে বোঝা যায় অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না। আর ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট মানে কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবনটি ব্যবহারযোগ্য। এই তিনটি কাগজ ছাড়া ফ্ল্যাট কেনা মানে ঝুঁকি হাতে কিনে নেওয়া।
ফায়ার NOC, পরিবেশ ছাড়পত্র ও BNBC ২০২০ মান
বহুতল ভবনে ফায়ার NOC আর ফায়ার এক্সিট বাধ্যতামূলক। সিঁড়ি প্রশস্ত কি না, ফায়ার হোজ আর অ্যালার্ম আছে কি না, নিজে চোখে দেখুন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আসলে প্রকল্পের পরিবেশগত অনুমোদন বোঝায়। BNBC ২০২০ মানে সয়েল টেস্ট, পাইলিং আর সিসমিক জোন বিবেচনায় ডিজাইন। ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলে এটা কোনো বাড়তি সুবিধা নয়, বাধ্যবাধকতা।
ডেভেলপার, প্রজেক্ট আর ফ্ল্যাট বাছাইয়ের সময় লুকানো ঝুঁকি
ভালো ডেভেলপার মানে ভালো বিজ্ঞাপন নয়। কাজের রেকর্ড, আইনি নথি আর অতীত প্রকল্পের হ্যান্ডওভার সময়, এই তিনটাই আসল পরিমাপক। এখানে তাড়াহুড়ো করলে সবচেয়ে বেশি লোকসানের আশঙ্কা থাকে।
ডেভেলপারের ট্র্যাক রেকর্ড ও চলমান প্রকল্প
প্রতিষ্ঠানটি কত বছর ধরে কাজ করছে, কতটি প্রকল্প শেষ করেছে, সেগুলো কোথায় সেটি দেখুন। অন্তত দুইটি পুরোনো প্রকল্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়।
চলমান প্রকল্পের নির্মাণ কাজ এখন কোন পর্যায়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাঠামো শেষ হয়েছে কি না, রাজমিস্ত্রির কাজ চলছে কি না, না কি এখনও মাটির কাজ। মাটির কাজ বলেই যদি বুকিং চলে, তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ধরে নিন।
বায়নাপত্র ও ডেভেলপার অ্যাগ্রিমেন্টের ফাঁক
বায়নাপত্র হলো প্রাথমিক চুক্তিপত্র, যেখানে দাম আর শর্ত লেখা থাকে। এখানে কোন ফ্ল্যাট, কোন ফ্লোরে, কত বর্গফুট, এই তথ্য স্পষ্ট থাকতে হবে।
সাবধানে দেখুন তিনটা জায়গা।
- হ্যান্ডওভারের তারিখ আর দেরি হলে ক্ষতিপূরণের ধারা।
- ফ্ল্যাটের আকার বদলালে বা কর্নার প্লটে লে-আউট বদলালে কী হবে।
- পেমেন্ট বিলম্বে কী শাস্তি, আর কাজ বিলম্বে কী সুবিধা মিলবে।
মৌখিক প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই। যা বলা হয়, সব লিখিত নিন।
নকশা, ম্যাটেরিয়াল আর ফ্লোর প্ল্যানের বাস্তবতা
নমুনা ফ্ল্যাট দেখতে বড় লাগে, কারণ সাজানো থাকে। খালি ফ্ল্যাটে ঢুকে ফিটা মেপে নিন। দরজা আর জানালার দিক, বাতাস চলাচল, রান্নাঘরের জায়গা, সব হিসাব করুন।
ছোট ফ্ল্যাটে কাজের জায়গা ঠিক করার সময় আলো আর আসবাবের দিক আগেই ভেবে নিন। ঘরের আলো যদি পর্দায় পড়ে, তবে দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য পর্দার সেটিংস নিয়ে ভাবতে হবে।
দিনে আট ঘণ্টা বসে কাজ করলে পর্দার গতি আর গুনমানও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত গতির ভিডিওতে ঝাপসা ভাব এড়াতে প্যানেলের রেসপন্স আচরণ বোঝা দরকার হয়।
বসার ঘরে বিনোদনের প্ল্যান থাকলে বড় পর্দায় ছবি দেখার অভিজ্ঞতা কীভাবে হয়, সেটাও ভেবে নিন। ছোট ঘরে বাঁকা নাকি সমতল পর্দা মানায়, তা নিয়েও অফিসের কাজে পর্দা বাছাইয়ের হিসাব মাথায় রাখুন।
দাম, খরচ আর হোম লোনের আসল হিসাব
ফ্ল্যাটের দাম মানে শুধু প্রতি বর্গফুটের রেট নয়। সঙ্গে যোগ হয় রেজিস্ট্রেশন খরচ, সার্ভিস চার্জ, পার্কিং, ইউটিলিটি ডিপোজিট আর লোনের সুদ। তাই বাজেট বানানোর সময় এই সব মিলিয়ে হিসাব করতে হয়।
প্রতি বর্গফুট রেট আর লুকানো চার্জ
একই এলাকার দুইটি প্রকল্পে রেট আলাদা হয় ফিনিশিং, লিফট, পার্কিং আর কমন এরিয়ার কারণে। প্রতিটি খাত আলাদা করে লিখিয়ে নিন।
সাধারণ লুকানো খরচগুলো হলো:
- পার্কিং চার্জ, যা প্রায়ই দামের বাইরে রাখা হয়।
- সার্ভিস চার্জ আর জেনারেটর চালানোর খরচ।
- ইউটিলিটি সংযোগের ডিপোজিট।
- সোসাইটি গঠনের খরচ আর হস্তান্তরের ফি।
এই খাতগুলো না জেনে বাজেট করলে প্রথম মাসেই ধরাশায়ী হবেন।
স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, উৎস কর ও মিউটেশন ফি
রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে সরকারি খরচ আসে। প্রচলিত হিসাবে মোট খরচ দলিল মূল্যের কয়েক শতাংশ হয়ে থাকে, তবে হার সময়ে সময়ে বদলায়। তাই চূড়ান্ত হিসাব সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকেই জেনে নিন।
| খরচের খাত | কোথায় যাচাই করবেন |
|---|---|
| স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি | সাব-রেজিস্ট্রি অফিস |
| মিউটেশন বা নামজারি ফি | সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস |
| উৎস কর ও ট্যাক্স সনদ | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড |
| ডেভেলপারের সার্ভিস চার্জ | প্রকল্প অফিস, চুক্তিপত্রে লিখিত |
মিউটেশন আলাদা খরচ আর আলাদা সময়। অনেক ক্রেতা রেজিস্ট্রেশন করেই থেমে যান, পরে নামজারি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।
হোম লোন, CIB, e-TIN ও ব্যাংক ভ্যালুয়েশন
ব্যাংক লোন দেওয়ার আগে আপনার CIB রিপোর্ট, e-TIN আর আয়ের প্রমাণ দেখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী আবাসন ঋণের শর্ত আর লোন-টু-ভ্যালু অনুপাত নির্ধারিত হয়।
ব্যাংক যে দামে ফ্ল্যাটের মূল্যায়ন করবে, ডেভেলপারের দামের চেয়ে সেটি কম হতে পারে। তখন পার্থক্যের টাকা আপনাকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। এছাড়া ফিক্সড না ফ্লোটিং সুদ, দুটোরই সুবিধা-অসুবিধা আছে।
আগে প্রি-অ্যাপ্রুভাল নিয়ে নিলে দর কষাকষিতে সুবিধা মেলে।
বায়নাপত্র থেকে মিউটেশন ও হ্যান্ডওভার, ধাপে ধাপে নিরাপদ পথ
নিরাপদ উপায় হলো ধাপে ধাপে এগোনো। কোনো ধাপের কাগজ না পাওয়া পর্যন্ত পরের ধাপে টাকা দেবেন না। নিচের ধারাটি মাথায় রাখলে মাঝপথে ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা কমে।
| ধাপ | হাতে থাকবে |
|---|---|
| জমি ও মালিকানা যাচাই | দলিল, খতিয়ান, পর্চা, ওয়ারিশ সনদ |
| প্রকল্প যাচাই | রাজউক অনুমোদন, বিল্ডিং পারমিট |
| বায়নাপত্র | লিখিত শর্ত আর টাকার রিসিট |
| অ্যাগ্রিমেন্ট | পেমেন্ট শিডিউল, হ্যান্ডওভার তারিখ |
| রেজিস্ট্রেশন | সাফ-কবলা দলিল, স্ট্যাম্প |
| মিউটেশন | নামজারি, হালনাগাদ খতিয়ান |
| হ্যান্ডওভার | ডেলিভারি সার্টিফিকেট, স্নাগ লিস্ট |
কোন ধাপে কোন কাগজ হাতে থাকবে
অগ্রিম দেওয়ার আগে সবসময় ব্যাংক চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফার ব্যবহার করুন। নগদ লেনদেনে প্রমাণ থাকে না। প্রতিটি রিসিটে তারিখ, পরিমাণ আর কোন খাতে দিচ্ছেন, সেটি লিখিয়ে নিন।
হ্যান্ডওভারের সময় ডিফেক্ট লিস্ট তৈরি করুন। টাইলস ভাঙা, দরজা আটকে যাওয়া, প্লাম্বিং লিক, এসব লিখিতভাবে দিন। ওয়ারেন্টির কাগজ আর ইউটিলিটি ট্রান্সফারের নথি হাতে না এলে চূড়ান্ত পেমেন্ট আটকে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কখন আইনজীবী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বা ভূমি বিশেষজ্ঞকে পাশে নেবেন
কাগজ জটিল হলে আইনজীবী লাগবেই। বিশেষ করে যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, উত্তরাধিকার বিরোধ বা একাধিক খতিয়ান থাকে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দরকার হয় কাঠামো আর নকশা বোঝার জন্য। আন্ডার-কনস্ট্রাকশন ফ্ল্যাট নিলে সয়েল টেস্ট রিপোর্ট, স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং আর ম্যাটেরিয়ালের মান যাচাই করিয়ে নিন।
ভূমি বিশেষজ্ঞ বা সার্ভেয়ার সাহায্যে জমির পরিমাণ আর সীমানা মিলিয়ে নেওয়া যায়। যাচাইয়ের খরচ যতই লাগুক, ভুল সিদ্ধান্তের খরচ তার চেয়ে অনেক বেশি।
ঢাকার কোন এলাকা, কোন ফ্ল্যাট আপনার জন্য
এলাকা বাছাই মানে শুধু দাম নয়। প্রতিদিনের যাতায়াত, বাচ্চার স্কুল, বাজার আর হাসপাতাল, সব কিছুর হিসাব মিলিয়ে দেখতে হয়। জায়গা সুন্দর হলেও যাতায়াতে দিনে তিন ঘণ্টা নষ্ট হলে সেটা কোনো সুবিধা নয়।
বাজেট আর জীবনযাত্রার মিল
আগে ঠিক করুন আপনার বাজেট কত, আর কতটা ফ্ল্যাট দরকার। ৮০০ থেকে ১২০০ বর্গফুট ফ্ল্যাট ছোট পরিবারের জন্য যথেষ্ট। ১৫০০ বর্গফুটের বেশি মানে দাম আর মাসিক সার্ভিস চার্জও বেড়ে যায়।
এলাকার সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক বুঝে নিন। গুলশান, বনানী বা বারিধারায় প্রতি বর্গফুটের রেট অনেক বেশি। অন্যদিকে মিরপুর, খিলগাঁও বা বাড্ডায় একই আকারের ফ্ল্যাট অনেক কম দামে মেলে।
ফ্লোর, ফেসিং, পার্কিং ও লিফট
উপরের ফ্লোরে বাতাস ভালো, রাস্তার শব্দও কম। তবে লিফট বন্ধ থাকলে ওঠানামা কষ্টকর হয়ে পড়ে। বয়স্ক বা ছোট বাচ্চা থাকলে মাঝের ফ্লোর নিরাপদ।
পার্কিং স্পেস লিখিতভাবে নিন। কিছু প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাটের জন্য একটি স্লট, আবার কোথাও আলাদা টাকা লাগে। লিফটের সংখ্যা আর জেনারেটরের ক্ষমতাও জেনে রাখুন।
এলাকাভিত্তিক বাস্তবতা, যাতায়াত, জলাবদ্ধতা, দূষণ
যদি আপনার অফিস মতিঝিলে হয়, তাহলে উত্তরার ফ্ল্যাট মানে প্রতিদিন লম্বা যাতায়াত। শীতের সকালে আর বর্ষার দিনে সেই সময় আরও বাড়ে।
বর্ষায় জলাবদ্ধতা অনেক এলাকায় বড় সমস্যা। সড়কের উচ্চতা, ড্রেন আর প্লাবনের ইতিহাস স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনে নিন। এছাড়া ব্যস্ত সড়কের পাশে বায়ু আর শব্দ দূষণও ভাবতে হবে।
নিজের কাজের কোণ বানানোর পরিকল্পনা থাকলে জায়গা আর আলো আগেই ভাবুন। ছোট ঘরে বাড়তি ছোট পর্দা যোগ করা অনেকের কাজে লাগে।
নতুন ফ্ল্যাটে আসবাব গোছানোর সময় পর্দা পরিষ্কারের নিয়ম জানা থাকলে যন্ত্রপাতি অনেক দিন ভালো থাকে।
হ্যান্ডওভার ও তারপর, যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি টাকা খায়
হ্যান্ডওভারের দিনটাই সবচেয়ে ব্যস্ত দিন। এই সময়ে যা লিখিয়ে না নিলে পরে মেরামতের পুরো খরচ আপনার ঘাড়ে আসে। তাই চাবি নেওয়ার আগে অন্তত একবার খালি ফ্ল্যাটে দিনের আলোয় ঘুরে দেখুন।
স্নাগ লিস্ট থেকে ওয়ারেন্টি
প্রতিটি ঘরে গিয়ে খুঁতের তালিকা বানান। টাইলস ফাটা, দেয়ালের ফাটল, দরজা আটকে যাওয়া, বাথরুমে পানি জমে থাকা, সব লিখুন।
ছবি তুলুন আর তারিখসহ ডেলিভারি সার্টিফিকেটে উল্লেখ করান। ডেভেলপার কোন খাতে কত দিন ওয়ারেন্টি দিচ্ছেন, সেটিও কাগজে লিখিয়ে নিন। মূল মেরামত শেষ না হলে চূড়ান্ত পেমেন্ট আটকে রাখুন।
সার্ভিস চার্জ, হোল্ডিং ট্যাক্স ও সোসাইটি
সার্ভিস চার্জ প্রতি মাসে দিতে হয়, এমনকি ফ্ল্যাট খালি থাকলেও। শুরুতে প্রতি বর্গফুট হিসেবে হিসাব হয়, পরে ধীরে ধীরে বাড়ে।
হোল্ডিং ট্যাক্স জমা হয় সিটি কর্পোরেশনের কাছে। বকেয়া থাকলে ফ্ল্যাটের সঙ্গেই সেই দায় হস্তান্তর হয়। তাই হ্যান্ডওভারের আগে বকেয়া চুকিয়ে নিন বা কাগজে লিখিয়ে নিন।
সোসাইটি গঠন হলে তারাই নিয়ম, পার্কিং আর মেরামতের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাহী কমিটির আগের সভার নোটিশ আর খরচের হিসাব চেয়ে দেখুন।
ভাড়া দেওয়া বা বিক্রি করার আগে
ভাড়া দিলে চুক্তিপত্রে মাসিক ভাড়া, সিকিউরিটি ডিপোজিট আর ভাঙালে কী হবে, লিখে নিন। ইউটিলিটি বিলের হিসাব আলাদা রাখুন।
বিক্রির আগে মিউটেশন হালনাগাদ আছে কি না দেখুন। খতিয়ানে আপনার নাম না থাকলে ক্রেতা দাম কম ধরবেন। আর ব্যাংকের কোনো ঋণ থাকলে সেটি আগেই শোধ করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বায়নাপত্র করার আগে কোন কাগজ সবচেয়ে জরুরি?
জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করাই প্রথম কাজ। মূল দলিল, হালনাগাদ খতিয়ান আর মিউটেশন রেকর্ড মিলিয়ে দেখুন। সঙ্গে রাজউক অনুমোদন আর বিল্ডিং পারমিট নিন।
এই কাগজগুলো পরিষ্কার না হলে টাকা দেওয়া উচিত নয়।
ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট না থাকলে কী হয়?
ওকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া ভবনটি সম্পূর্ণ আইনগতভাবে বৈধ নয়। অনেক ব্যাংক এমন ফ্ল্যাটে লোন দিতে চায় না। বিদ্যুৎ, পানি আর গ্যাস সংযোগেও দেরি হতে পারে।
ভবিষ্যতে বিক্রি বা বন্ধক রাখতেও বাধা আসে।
হোম লোন নিতে কত সময় লাগে?
প্রি-অ্যাপ্রুভাল সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহে পাওয়া যায়। প্রকল্পের কাগজ যাচাই আর সাইট ভ্যালুয়েশনে আরও সময় লাগে। আইনি সনদ শেষ হলে ডিসবার্সমেন্ট হয়।
পূর্ণ প্রক্রিয়ায় এক থেকে তিন মাস লেগে যেতে পারে।
মিউটেশন না করলে কী সমস্যা হবে?
মিউটেশন না হলে খতিয়ানে আপনার নাম বসে না। তখন সরকারি রেকর্ডে মালিক হিসেবে আপনি স্বীকৃত নন। পরে বিক্রি, বন্ধক বা উত্তরাধিকার হস্তান্তরে জটিলতা তৈরি হয়।
তাই রেজিস্ট্রেশনের পরপরই নামজারি করে নিন।
রিসেল ফ্ল্যাট কীভাবে যাচাই করব?
রিসেল ফ্ল্যাটে আগের মালিক আর সোসাইটি, দুই দিকই দেখতে হয়। সার্ভিস চার্জ আর হোল্ডিং ট্যাক্সের বকেয়া আছে কি না জেনে নিন। দলিলে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা আর ব্যাংকের কোনো ঋণ আছে কি না যাচাই করুন।





















